@himu98i6: শত্রুকে আমি প্রাচীর ভেবেছিলাম; বন্ধুকে ভেবেছিলাম দরজা। মানুষের এই ভুল এত পুরোনো যে ইতিহাসের কোনো গ্রন্থে তার প্রথম পৃষ্ঠা খুঁজে পাওয়া যায় না। জন্মের পর থেকেই আমরা শিখি—কোন মুখ আপন, কোন মুখ পর; কোন হাত করমর্দনের জন্য, আর কোন হাত প্রতিরোধের জন্য। অথচ জীবনের গভীরতম প্রতারণাগুলো প্রায়ই আসে পরিচিত হাত থেকেই। প্রাচীর শুধু ইট-পাথরে তৈরি হয় না। একটি সন্দেহ প্রাচীর হতে পারে, একটি ধর্ম, একটি পতাকা, একটি পুরোনো অপমান, এমনকি একটি বন্ধুত্বও। মানুষ নিরাপত্তার নামে নিজের চারপাশে যত বেশি দেয়াল তোলে, কখনো কখনো তত গভীরভাবে নিজের কারাগার নির্মাণ করে। আমি একদিন ভেবেছিলাম, শত্রু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে; তাই দরজা বন্ধ করেছিলাম। পরে বুঝলাম, বিপদ বাইরে ছিল না—বিপদ ছিল সেই বিশ্বাসে, যার কারণে দরজা খুলতে ভয় পেয়েছিলাম। বন্ধুত্বকে আমরা আশ্রয় বলি। কিন্তু আশ্রয়ও কখনো মানুষের সবচেয়ে নরম দুর্বলতা। শত্রুর আঘাতের জন্য মানুষ প্রস্তুত থাকে; বন্ধুর আঘাতের জন্য থাকে না। শত্রু ছুরি তুললে আমরা হাত বাড়িয়ে তাকে থামাই। বন্ধু যখন হৃদয়ের ভেতর ছুরি রেখে যায়, তখন আমরা দীর্ঘদিন সেটিকে ফুল ভেবে বুকে ধারণ করি। তাই বিশ্বাসঘাতকতা হত্যার চেয়েও গভীর। হত্যা শরীরকে শেষ করে; বিশ্বাসঘাতকতা মানুষের বিচারবোধকে হত্যা করে। সে শেখায়—কাকে বিশ্বাস করব? এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসও সহজে দেয়নি। রাষ্ট্র বলে, আমাকে বিশ্বাস করো। ধর্ম বলে, আমাকে অনুসরণ করো। বন্ধুত্ব বলে, আমার পাশে থাকো। প্রেম বলে, নিজেকে আমার হাতে দাও। আর ইতিহাস নীরবে বলে—কাউকেই অন্ধভাবে নয়। কারণ মানুষ নিজের মুখ সম্পর্কেও সবসময় সত্য জানে না। আমরা অন্যের স্বার্থকে বলি প্রতারণা, নিজের স্বার্থকে বলি প্রয়োজন। অন্যের নিষ্ঠুরতাকে বলি অপরাধ, নিজের নিষ্ঠুরতাকে বলি পরিস্থিতি। অন্যের মিথ্যাকে বলি চরিত্রের দোষ, নিজের মিথ্যাকে বলি বেঁচে থাকার কৌশল। মানুষের নৈতিকতা তাই অদ্ভুত। সে ন্যায় চায়, যতক্ষণ ন্যায় তার বিরুদ্ধে না যায়। সে সত্য চায়, যতক্ষণ সত্য তার নিজের মুখের দিকে আঙুল না তোলে। সে স্বাধীনতা চায়, যতক্ষণ অন্যের স্বাধীনতা তার সুবিধাকে বিপন্ন না করে। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু প্রাচীর পাথরের নয়; মানুষের আত্মপক্ষসমর্থন দিয়ে নির্মিত। প্রতিটি ইট একটি অজুহাত, প্রতিটি জানালা একটি মিথ্যা, প্রতিটি দরজা একটি ভয়। অথচ প্রতিটি তালার চাবি মানুষের নিজের পকেটেই থাকে। তবু সে চাবি খুঁজতে চায় না, কারণ মুক্তির চেয়ে কারাগারের সঙ্গে অভ্যস্ত থাকা সহজ। একজন মানুষ যখন বহুবার প্রতারিত হয়, প্রথমে বলে, “সবাই খারাপ নয়।” পরে বলে, “কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।” শেষে বলে, “আমিও আর কাউকে ভালোবাসব না।” শেষ বাক্যটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ তখন মানুষ পৃথিবীকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের হৃদয়কে কারাগারে পাঠায়। সে ভাবে, দরজা বন্ধ করলে কেউ আর প্রবেশ করতে পারবে না। ভুলে যায়—দরজা বন্ধ হলে আলোও প্রবেশ করতে পারে না। তখন রাত বাইরে থাকে না; মানুষের ভেতর জন্ম নেয়। একদিন সে নিজের ছায়াকেও অপরিচিত মনে করতে শুরু করে। তবু প্রশ্ন থাকে—শত্রু কে? যে আমাদের ক্ষতি করতে চায়, নাকি যে আমাদের এমনভাবে বিশ্বাস করতে শেখায়, যাতে তার ক্ষতি করার ক্ষমতা জন্মায়? আর বন্ধু? যে পাশে থাকে, নাকি যে প্রয়োজন হলে আমাদের সত্য বলার সাহস রাখে? বন্ধুত্বের কঠিন পরীক্ষা হলো—সে তোমার সুখ চায়, নাকি তোমার দুর্বলতার ওপর নিজের প্রয়োজন নির্মাণ করে। মানুষ প্রায়ই এমন সম্পর্ককে ভালোবাসা বলে, যেখানে সে প্রতিদিন একটু একটু করে স্বাধীনতা হারায়। ভালোবাসার নামে বন্দিত্ব মেনে নেওয়া সহজ; বন্দিত্বের নাম যদি হয় আপনজন, মানুষ শিকলকেও অলংকার ভেবে পরে। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সবসময় সে নয়, যে তোমাকে ঘৃণা করে। বরং সে, যে তোমাকে এমনভাবে ভালোবাসে যে তোমার স্বাধীনতাকে সহ্য করতে পারে না। ঘৃণা দূরত্ব সৃষ্টি করে; অতিরিক্ত অধিকার কারাগার সৃষ্টি করে। আর কারাগারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—কখনো কখনো বন্দি নিজেই তার প্রহরীকে ভালোবাসে। শেষ পর্যন্ত বুঝলাম—প্রাচীরের ওপারে সবসময় শত্রু থাকে না; কখনো থাকে আরেকজন ভীত মানুষ। আর দরজার ভেতরেও সবসময় বন্ধু থাকে না। তাই ভালোবাসো, বিশ্বাস করো, কিন্তু নিজের বিচারবোধ হারিয়ো না। দরজা খোলো, তবে চাবি নিজের কাছেই রাখো। কারণ মুক্ত মনই শেষ আশ্রয়। লেখক আরফান সাদিক হিমু
কবি হিমু📒
Region: SA
Tuesday 25 August 2026 19:38:23 GMT
Music
Download
Comments
RAKIB 🤍 MIRDDA..🌸 :
উনার লেখাগুলো খুব সুন্দর হইছে,,😅
2026-08-25 21:37:36
0
- প্রতারক 🗣️ :
😅😅😅
2026-08-25 19:49:46
0
To see more videos from user @himu98i6, please go to the Tikwm
homepage.